চিকিৎসার জন্য বিদেশে ছুটে যাওয়া, বাংলাদেশের মানুষের কাছে বহুদিনের পরিচিত বাস্তবতা। উন্নত চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি ও নির্ভরযোগ্য সেবার আশায় প্রতিবছর বহু মানুষ দেশের বাইরে যান।
সেই বাস্তবতা বদলের স্বপ্ন নিয়েই রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এন ব্লকে নির্মিত হতে যাচ্ছে বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি ও ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল। হাসপাতালটির নির্মাণকাজ এখনো শুরু না হলেও এর শেয়ার বুকিংয়ে দেশ-বিদেশ থেকে পাওয়া সাড়া ইতোমধ্যে উদ্যোক্তাদের আশাবাদী করে তুলেছে।
হাসপাতাল প্রকল্পটিকে ঘিরে রাজধানীর বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের ৫ নম্বর হলে চলছে শেয়ার বুকিং মেলা। সেখানে প্রতিদিনই আগ্রহী মানুষ আসছেন, প্রকল্প সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং বিনিয়োগের বিষয়ে কথা বলছেন।
বিশেষ করে প্রবাসীদের কাছ থেকে আশাতীত সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে প্রকল্পের উদ্যোক্তারা জানান, এটি হবে ১ হাজার শয্যার একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল।
আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো ও বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসেবা এক জায়গায় দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে দেশের রোগীদের বিদেশমুখী চিকিৎসা প্রবণতা কমবে- এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এস রহমান প্রোপার্টিজের চেয়ারম্যান এস এম শাহিদুর রহমান বলেন, মেলায় বিশেষ করে প্রবাসীদের কাছ থেকে তারা আশাতীত সাড়া পাচ্ছেন। তিনি জানান, বিদেশ থেকে অনলাইনে বুকিংও পাওয়া যাচ্ছে। ইতালি থেকে আসা কয়েকজন প্রবাসীও মেলায় শেয়ার নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
চেয়ারম্যানের দাবি, হাসপাতালের একটি শেয়ারের মূল্য ৬০ লাখ টাকা। ভবিষ্যতে শেয়ারের মূল্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি শেয়ারধারী ও তার পরিবারের জন্য চিকিৎসাসেবায় বিশেষ সুবিধা ও ছাড় থাকার কথাও জানান তিনি। তার মতে, বিনিয়োগের সঙ্গে চিকিৎসাসুবিধা ও সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও যুক্ত থাকছে।
মেলায় আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও প্রকল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রত্যাশা। রাশেদ আহমেদ নামে এক দর্শনার্থী জানান, তার চাচা বিদেশে থাকেন। দেশে কোথায় বিনিয়োগ করা যায়, তা নিয়ে ভাবছিলেন। পরে তিনি এই প্রকল্পে বিনিয়োগের পরামর্শ দেন।
রাশেদ বলেন, “এটা শুধু বিনিয়োগ নয়, ভবিষ্যতের চিকিৎসাসুবিধার বিষয়টিও এখানে আছে। চাচা দেশে ফিরলে চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। সেই সঙ্গে একটি ভালো প্রকল্পে বিনিয়োগও হবে, এই চিন্তা থেকেই বুকিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তবে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন ও হস্তান্তর করা হবে এটাই তার প্রত্যাশা।
আরেক দর্শনার্থী সাইফ বলেন, “দেশে এমন একটি বড় হাসপাতাল হলে সাধারণ মানুষের জন্যও সুবিধা হবে। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কিছুটা হলেও কমতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা দেশে পাওয়া গেলে রোগী ও পরিবারের অনেক ঝামেলা কমে যাবে।”
তার মতে, বড় হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি চিকিৎসার মান, দক্ষ চিকিৎসক এবং সেবার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করাটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খিলগাঁও থেকে স্বামীর সঙ্গে এসেছেন নাজমা। তিনি বলেন, “আমরা অনেক সময় চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবি শুধু ভালো সুবিধার জন্য। যদি একই ধরনের সেবা দেশে পাওয়া যায়, তাহলে দেশের টাকাও দেশে থাকবে। এমন উদ্যোগ সফল হোক, এটাই চাই।”
স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে অর্থনীতিতেও প্রভাব
প্রকল্পটির অন্যতম সেলস ও মার্কেটিং পার্টনার রিসোকি (RisoKey)-র ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও বলেন, শুরু থেকেই তিনি প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। তার মতে, বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, এর সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও যুক্ত করবে।
তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যাতে চিকিৎসাসুবিধা পায়, সেই লক্ষ্যও বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। “আমার বিশ্বাস, এটি বাংলাদেশের অন্যতম আইকনিক প্রকল্প হতে যাচ্ছে” বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিদেশমুখী চিকিৎসা কমানোর প্রত্যাশা
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে যান। উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং চিকিৎসার ওপর আস্থার অভাবসহ নানা কারণে তৈরি হয় এ বিদেশমুখী প্রবণতা। বসুন্ধরা মেডিকেল সিটির উদ্যোক্তারা মনে করছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী হাসপাতালটি বাস্তবায়িত হলে সেই প্রবণতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বড় অবকাঠামো নির্মাণই শেষ কথা নয়। হাসপাতালটি বাস্তবে চালু হওয়ার পর চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা, সেবার স্বচ্ছতা, চিকিৎসা ব্যয়, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, এসব বিষয়ই নির্ধারণ করবে প্রকল্পটি মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারবে।
এখন পর্যন্ত বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি মূলত একটি বড় পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের আকার অবশ্য ছোট নয়- ১ হাজার শয্যা, ২৫টি ক্লিনিক্যাল বিভাগ, ১১টি বিশেষায়িত কেন্দ্র, ২৬টি অপারেশন থিয়েটার এবং আধুনিক ডায়াগনস্টিক ও সার্জারি সুবিধা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মানুষকে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী না করে দেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরির যে প্রত্যাশা উদ্যোক্তারা করছেন, সেটিই হবে এই চিকিৎসানগরীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
১৫ সেপ্টেম্বরের পরও সুবিধা বাড়ানোর ঘোষণা
শেয়ার বুকিং মেলা ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও প্রবাসীদের অনুরোধে মেলার সুবিধা আরও কয়েক দিন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
চেয়ারম্যান জানান, বিদেশে থাকা অনেক আগ্রহী বিনিয়োগকারী টাকা পাঠানোর সময়সূচির কারণে ১৪ বা ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বুকিং শেষ করতে পারছেন না। তাদের অনুরোধ বিবেচনায় মেলার বিশেষ সুবিধা ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন তিনি।
স্বপ্নের অংশীদার হওয়ার আহ্বান
বসুন্ধরার এন ব্লকে নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা এই হাসপাতালকে ঘিরে এখনো মূল আকর্ষণ ভবিষ্যতের স্বপ্ন। নির্মাণকাজ শুরু হয়নি, কিন্তু সেই স্বপ্নে অংশীদার হতে শেয়ার বুকিং মেলায় মানুষের উপস্থিতি তৈরি করেছে আলাদা আগ্রহ।
উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হবে। বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া মানুষের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি দেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরিতে হাসপাতালটি ভূমিকা রাখবে- এমনটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।
আর সেই প্রত্যাশাকে সামনে রেখে দেশের পাশাপাশি প্রবাসীরাও এখন বিনিয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যতের এই স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর অংশীদার হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
সূত্র: বাংলানিউজ24.কম
(ক্যাপশন- বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বসুন্ধরা মেডিকেল সিটি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের শেয়ার বিক্রি ও বুকিং মেলার উদ্বোধন করেন তানভীর বসুন্ধরা গ্রুপের (টিবিজি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ ইব্রাহিম সোবহান।)
চেয়ারম্যান : মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিন, সিইও : মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান ওয়াহিদ
ঠিকানা : ৭৩, উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
মোবাইল : ০১৯ ১১২৫ ১৯১০
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত