ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-সম্পদ রক্ষা, দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রবিবার দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জুম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
জুম মিটিংয়ে যোগ দেন আট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের উপ-মহা পুলিশ পরিদর্শক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জনসহ মাঠ কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সারা দেশে পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।’
আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘জলাবদ্ধতাসহ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-সম্পদ রক্ষা, দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও মাঠ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’
মাঠ কর্মকর্তারা সারা দেশে ভারি বর্ষণে বন্যা ও জলাবদ্ধতার সর্বশেষ পরিস্থিতি, ক্ষয়ক্ষতি, আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থা, উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ এবং চিকিৎসাসেবার অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন এবং এ ব্যাপারে মাঠ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন বলে জানান অতিরিক্ত প্রেস সচিব।
প্রধানমন্ত্রী মাঠ কর্মকর্তাদের বলেন, দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষাই প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী, শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শিশুখাদ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী এবং গর্ভবতী নারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ, পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সুবিধা সচল রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রধানমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন, দুর্যোগকালীন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধুচক্র যেন চুরি, ডাকাতি, মজুদদারি, ত্রাণ আত্মসাৎ বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
বৈঠকে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম, উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়, নদ-নদীর পানির স্তর এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
অতিরিক্ত প্রেস সচিব জানান, বৈঠকে চট্টগ্রাম থেকে যুক্ত হওয়া কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, সেখানকার জলাবদ্ধতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। সিলেট অঞ্চলে মনু নদীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং রংপুর বিভাগে নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্র্রধানমন্ত্রী সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ, প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং জনগণের পাশে থেকে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে কাজ করতে বলেছেন। সভায় বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকার জলাবদ্ধতার সর্বশেষ পরিস্থিতি, ক্ষয়ক্ষতি, আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থা, উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ এবং চিকিৎসাসেবার অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
ধানমণ্ডি-গুলশান লেক সংস্কার বিষয়ক বৈঠক : এদিকে রাজধানীর গুলশান-বারিধারা লেকের সংস্কার এবং স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্রকল্প স্থাপনের বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ধানমণ্ডি লেকের সংস্কার ও পুনর্নিমাণ, নজরুল সরোবরের নির্মাণ এবং ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনসংক্রান্ত প্রকল্প সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে গুলশান ও বারিধারা লেকে সংযুক্ত সব অবৈধ বর্জ্য নির্গমন লাইন আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং রাজউকের নেতৃত্বে গুলশান লেকের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য বর্ধন এবং পরিবেশগত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঢাকার লেকগুলোর পুনরুদ্ধার, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে স্যুয়ারেজ, ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন বিষয়ে কয়েকটি উপস্থাপনা পর্যালোচনা করেন।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন এবং রাজধানীর পরিবেশ ও জলাধার সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, গৃহায়ণ প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা সিটির বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বৈঠক : রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের সংগৃহীত বর্জ্য থেকে কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তা নিয়েও গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার প্রকল্প নিয়ে বৈঠক করেন। প্রকল্প দুটি দ্রুত এগিয়ে নিতে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠক করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বলেছেন।’
আমিনবাজারে বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে চীনের সিএমইসি গ্রুপ এবং মাতুয়াইলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প কোরিয়ার বিঅ্যান্ডএফ কম্পানি বাস্তবায়ন করবে। আমিনবাজারের প্রকল্পে প্রতিদিন ঢাকা শহরের প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়। ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যে প্রকল্পটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী ২৫ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। মাতুয়াইলের প্রকল্পে বর্জ্য থেকে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হবে, যা থেকে বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এটি দৈনিক প্রায় ২২১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমতুল্য। এ প্রকল্প থেকে সৌরবিদ্যুৎ, সার, পশুখাদ্য এবং পরিবেশবান্ধব ইকোব্রিকস উৎপাদন করা হবে। বৈঠকে প্রকল্প দুটির বিভিন্ন দিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ
চেয়ারম্যান : মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিন, সিইও : মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান ওয়াহিদ
ঠিকানা : ৭৩, উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
মোবাইল : ০১৯ ১১২৫ ১৯১০
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত